কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। গণিত ক্লাস চলছে। ক্লাসে প্রফেসর তাঁর ছাত্রদের সামনে জটিল গাণিতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছেন। ক্লাসরুমে ছাত্ররা মনোযোগ দিয়ে শুনছে, কিন্তু একজন
ছাত্র, জর্জ ডান্টজিগ, ক্লান্তির কারণে ঘুমিয়ে পড়েন। তিনি হয়তো আগের রাতে পড়াশোনা করেছিলেন বা অন্য কোনো কারণে ক্লান্ত ছিলেন। যাই হোক, তিনি ক্লাসের বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটান। ক্লাস শেষ হওয়ার পর ছাত্রদের চেঁচামেচি আর হট্টগোলের শব্দে তাঁর ঘুম ভাঙে। তিনি তাকিয়ে দেখেন, হোয়াইটবোর্ডে দুটি গাণিতিক সমস্যা লেখা রয়েছে। তিনি ধরে নেন, এই সমস্যাগুলো পরের ক্লাসের জন্য হোমওয়ার্ক হিসেবে দেওয়া হয়েছে। তাড়াহুড়ো করে তিনি সমস্যা দুটি খাতায় টুকে নেন এবং ক্লাস থেকে বেরিয়ে যান।
বাড়ি ফিরে জর্জ সমস্যা দুটির সমাধান করতে বসেন। কিন্তু কিছুক্ষণ চেষ্টার পর তিনি বুঝতে পারেন, এই সমস্যাগুলো অত্যন্ত জটিল এবং সমাধান করা সহজ নয়। সাধারণ হোমওয়ার্কের মতো এগুলো সরল গাণিতিক সমীকরণ নয়, বরং এগুলোর জটিলতা তাঁকে বিস্মিত করে। তবুও তিনি হাল ছাড়েন না। তাঁর মধ্যে একটি জেদ কাজ করে। তিনি ভাবেন, যেহেতু এটি হোমওয়ার্ক, তাই এটি অবশ্যই সমাধানযোগ্য। এই বিশ্বাস তাঁকে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে।
জর্জ লাইব্রেরিতে ছুটে যান। তিনি একের পর এক রেফারেন্স বই ঘাঁটতে থাকেন। গণিতের বিভিন্ন শাখা, তত্ত্ব, এবং সমীকরণ নিয়ে পড়াশোনা করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন কাটিয়ে দেন লাইব্রেরির টেবিলে। তাঁর মনের মধ্যে একটিই লক্ষ্য—এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। অবশেষে, অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তিনি একটি সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হন। দ্বিতীয় সমস্যাটি তাঁর কাছে তখনও অমীমাংসিত থেকে যায়, কিন্তু প্রথম সমস্যার সমাধান তাঁকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
পরবর্তী ক্লাসে জর্জ তাঁর সমাধান নিয়ে প্রফেসরের কাছে যান। তিনি ভেবেছিলেন, এটি হোমওয়ার্ক জমা দেওয়ার সময়। কিন্তু প্রফেসরের কাছে গিয়ে তিনি যে কথা শুনলেন, তা তাঁকে হতবাক করে দেয়। প্রফেসর তাঁকে জানান, হোয়াইটবোর্ডে লেখা সমস্যা দুটি কোনো হোমওয়ার্ক ছিল না। বরং, এগুলো ছিল গণিতের জগতে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত দুটি জটিল সমস্যা। প্রফেসর সেদিন ক্লাসে আলোচনা করছিলেন বিজ্ঞানের এমন কিছু সমস্যা নিয়ে, যেগুলো এখনো কেউ সমাধান করতে পারেনি। এই সমস্যাগুলো ছিল উদাহরণ হিসেবে, যাতে ছাত্ররা বুঝতে পারে গণিত এবং বিজ্ঞানের জগতে কতটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
জর্জের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। তিনি ভেবেছিলেন, এটি একটি সাধারণ হোমওয়ার্ক, কিন্তু বাস্তবে তিনি একটি অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন! তিনি প্রফেসরকে বললেন, “কিন্তু আমি তো একটি সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি!” প্রফেসর প্রথমে হয়তো বিশ্বাস করতে পারেননি। কিন্তু জর্জ যখন তাঁর সমাধান দেখালেন, তখন প্রফেসর বিস্মিত হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই তরুণ ছাত্রটি এমন একটি কাজ করে ফেলেছেন, যা গণিতের জগতে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।
জর্জের এই সমাধানটি শুধুমাত্র একটি ক্লাসরুমের গল্পে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর সমাধানটি পরবর্তীতে প্যাটেন্ট করা হয় এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ডকুমেন্টেড করা হয়। তাঁর লেখা পেপারগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শিত হয়, যা আজও গণিতের ছাত্রদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। জর্জ ডান্টজিগের এই কৃতিত্ব গণিতের জগতে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তিনি সমাধান করেছিলেন এমন একটি সমস্যা, যা গণিতবিদদের মধ্যে বহুল প্রয়োজনীয় “ম্যাথম্যাটিক্স স্ট্যাক এক্সচেঞ্জার” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
জর্জের এই সাফল্যের পেছনে একটি মূল কারণ ছিল—তিনি ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এই ঘুমের কারণে তিনি প্রফেসরের সেই কথা শুনতে পাননি যে, “এই সমস্যাগুলো এখনো কেউ সমাধান করতে পারেনি।” তিনি জানতেন না যে এগুলো অমীমাংসিত সমস্যা। তাঁর মনে ছিল একটি সরল বিশ্বাস—এটি একটি হোমওয়ার্ক, এবং এটি সমাধান করা সম্ভব। এই বিশ্বাস তাঁকে ভয়, উদ্বেগ, বা নেতিবাচক চিন্তা থেকে মুক্ত রেখেছিল। তিনি নিজের যোগ্যতার উপর ভরসা রেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছিলেন।
এই গল্প থেকে আমরা শিখতে পারি যে, আমাদের মধ্যে অনেক সময় সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু আমরা নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। “এটা অসম্ভব,” “আমি পারব না,” “এটি খুব কঠিন”—এই ধরনের নেতিবাচক চিন্তা আমাদেরকে পিছিয়ে দেয়। জর্জের গল্প আমাদের শেখায়, আমরা যদি নিজেদের উপর ভরসা রাখি এবং অটল থাকি, তাহলে অসম্ভব বলে কিছুই নেই।
জর্জ ডান্টজিগের এই গল্পটি কেবল গণিতের জগতের জন্য নয়, আমাদের সবার জন্য একটি শিক্ষা। আমরা প্রায়ই জীবনে এমন সমস্যার মুখোমুখি হই, যেগুলো দেখে মনে হয় অসম্ভব। কিন্তু জর্জের মতো যদি আমরা এই ধারণা পোষণ করি যে সমস্যাটি সমাধানযোগ্য, তাহলে আমরা সফল হতে পারি। এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাগুলো তখনই প্রকাশ পায়, যখন আমরা নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা ভুলে যাই।
এ জাতীয় আরো খবর..